চট্টগ্রাম বন্দরমুখী পণ্যে সারচার্জ আরোপের ঘোষণা ফ্রান্সভিত্তিক শিপিং কোম্পানির

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি পণ্যে সারচার্জ বা বাড়তি মাশুল আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সিএমএ–সিজিএম।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি পণ্যে সারচার্জ বা বাড়তি মাশুল আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সিএমএ–সিজিএম। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে গতকাল জানানো হয়, ২৬ অক্টোবর থেকে এ নতুন মাশুল কার্যকর হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় অপারেশন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ বাড়তি মাশুল বা জরুরি খরচ পুনরুদ্ধার নামে এ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএমএ সিজিএম। এ সারচার্জ বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে চট্টগ্রাম বা দেশের অন্য যেকোনো স্থানে পরিশোধ করতে হবে।

সিএমএ–সিজিএমের তথ্যানুযায়ী, কনটেইনারভেদে আমদানি-রফতানিতে মাশুল দিতে হবে ৪৫-৩০৫ ডলার পর্যন্ত, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ৫২০ থেকে ৩৭ হাজার ৪১৪ টাকা।

শিপিং কোম্পানিটি জানিয়েছে, এ সারচার্জ চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আমদানি-রফতানি হওয়া সব চালানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এটি চালান বা চুক্তির শর্ত নির্বিশেষে স্থানীয়ভাবে পরিশোধ করতে হবে।

সিএমএ–সিজিএমের বক্তব্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন ট্যারিফ পুনর্বিন্যাসের ফলে স্থানীয় অপারেশনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ অতিরিক্ত ব্যয় আংশিক পুনরুদ্ধারের জন্যই সারচার্জ আরোপ করা। কোম্পানিটি বলছে, এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনর্বিবেচনা করা হবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ যে মাশুল বাড়িয়েছে তার একটি অংশ দিচ্ছে শিপিং কোম্পানিগুলো। তবে বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, শিপিং কোম্পানিগুলো এ বাড়তি খরচ দিন শেষে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই আদায় করবে। সিএমএ–সিজিএমের এ উদ্যোগের পর পর অন্য শিপিং লাইনগুলোও শিগগিরই অনুরূপ সারচার্জ আরোপ করতে পারে। এতে সামগ্রিকভাবে আমদানি-রফতানির খরচ আরো বৃদ্ধি পাবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) প্রথম সহসভাপতি ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বলেন, ‘রফতানি খরচ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তৈরি পোশাকের প্রতিটি চালানে অতিরিক্ত খরচ হলে বিদেশী ক্রেতারা সহজেই অন্য দেশ বেছে নেয়।’

তার মতে, বন্দর ও শিপিং কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তের প্রভাব শেষ পর্যন্ত উৎপাদক ও রফতানিকারকদের ওপরই পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএএ) সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর একসঙ্গে ট্যারিফ বাড়ানোয় বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। সিএমএ সিজিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ পুনর্বিন্যাসের ফলে স্থানীয় অপারেশনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু এ বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই বর্তাবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে চাইছে চট্টগ্রাম বন্দর। এজন্য আধুনিক সেবা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হচ্ছে।’

শিপিং লাইনগুলোর সারচার্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’

ওমর ফারুক আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন ট্যারিফ ১৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর হচ্ছে, এটি ট্যারিফ পুনর্বিন্যাস। নতুন যন্ত্রপাতি, আধুনিক টার্মিনাল ও ড্রেজিংসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বন্দরের ব্যয় বেড়ে গেছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়েছে।’

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, ট্যারিফ ও সারচার্জ মিলিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। এতে রফতানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস ও আমদানি পণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া সিএমএ–সিজিএমের এ পদক্ষেপের ফলে অন্য বড় লাইন যেমন মায়ারস্ক, হ্যাপাগ লয়েড বা ওওসিএলও শিগগিরই অনুরূপ বাড়তি চার্জ আরোপ করতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ১৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন মাশুলের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে আগের তুলনায় গড়ে ৪১ শতাংশ হারে মাশুল বাড়ানো হয়। বন্দরের সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের এ মাশুল দিতে হবে। নতুন ট্যারিফ ১৪ অক্টোবর রাত ১২টার পর থেকে কার্যকর হবে।

আরও